জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, দেশে আবারও মতপ্রকাশ দমন, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে। তিনি বলেন, বিরোধী মত দমনে মামলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জেরে বাসা থেকে তুলে নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরপূর্বক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেশে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে যেখানে বিরোধী মতকে দমন করতে আইন ও প্রশাসনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিমন্ত্রী বা হুইপকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার কারণেও মানুষকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি, যেখানে ভিন্নমতকে ভয় দেখিয়ে দমন করা হতো। এত ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে নতুন সংসদ গঠনের পরও আবার একই ‘বিষাক্ত চক্রে’ ফিরে যাওয়া হতাশাজনক।
হাসনাত বলেন, দেশে কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়, দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারপ্রধানকে সমালোচনা করার অধিকার থাকতে হবে এবং নাগরিকদের এমন পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখতে গিয়ে মানুষকে ‘ব্যাকস্পেস’ ব্যবহার করে ভয়ে শব্দ মুছতে না হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশে বেছে বেছে বিরোধিতা দমন করা হচ্ছে। তার ভাষায়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নারীদের সমালোচনা হলে সেটিকে নারী বিদ্বেষ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু শ্রমজীবী ও প্রান্তিক নারীদের অপমানকে একইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই ‘নির্বাচিত নৈতিকতা’ থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেশের ক্যাম্পাসগুলো আবার অস্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। অতীতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ সংস্কৃতি নতুন করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার বাধ্যতামূলক ছাত্ররাজনীতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাধারণ পরিবারের সন্তানদের ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের সন্তানরা বিদেশে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে, আর মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। এই বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির কারখানা নয়, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মী নয়, গবেষক ও চিন্তাশীল নাগরিক বেরিয়ে আসা উচিত।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ সংস্কার কমিশনের অধ্যাদেশও বাতিল করা হয়েছে। পরে সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হলেও, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সেগুলো কার্যকর রেখেই সংস্কার করা যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিভাজনের রাজনীতি কোনো দলের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। বিএনপি, এনসিপি বা জামায়াত—কেউই এতে লাভবান হবে না; বরং অতীতে পরাজিত শক্তিগুলোই আবার শক্তি সঞ্চয় করবে।
সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দমন, নিপীড়ন ও বিনাশের রাজনীতি দেশে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে তা কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না। তাই গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
