সিলেটে সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে একদিনে তিনজন খুন হয়েছেন। রোববার (২৫ অক্টোবর) বালাগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৃথক এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জকিগঞ্জে ছেলের হামলায় মায়ের মৃত্যু হয়েছে, বালাগঞ্জে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধে ভাতিজার হাতে খুন হয়েছেন চাচা এবং কোম্পানীগঞ্জে পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইয়ের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এক যুবক।
তিনটি ঘটনায়ই পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে বালাগঞ্জে জমি বিক্রির টাকা এবং জকিগঞ্জে জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, কোম্পানীগঞ্জে পুকুরের মালিকানা ও মাছ ধরা নিয়ে বিরোধের জেরে হামলায় এক যুবক নিহত হন।
বালাগঞ্জে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধে চাচা খুন
বালাগঞ্জে পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজা টিটু মিয়ার ছুরিকাঘাতে আবুল মিয়া (৬৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁর আরেক ভাই আব্দুল কাদিরও গুরুতর আহত হয়েছেন।
রোববার রাত ৮টার দিকে উপজেলার পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নের মুসলিমাবাদ ডেকাপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আবুল মিয়া ও অভিযুক্ত টিটু মিয়া একই বাড়িতে বসবাস করতেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমি বিক্রির ১২ লাখ টাকা নিয়ে চাচা আবুল মিয়া ও আব্দুল কাদিরের সঙ্গে টিটু মিয়ার বিরোধ চলছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে টিটু তাঁর বসতবাড়ির জায়গা দুই চাচার কাছে বিক্রি করেন। তাঁরা টাকা পরিশোধ করলেও জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে জায়গাটি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
রোববার রাতে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে টিটু ধারালো ছুরি দিয়ে আবুল মিয়ার বুকে আঘাত করেন। এ সময় দা দিয়ে আব্দুল কাদিরের মাথা ও হাতে কোপ দেওয়া হয়। পরে আবুল মিয়াকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত আব্দুল কাদিরকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আব্দুল কাদিরের অভিযোগ, টিটু তাঁর ভাইকে হত্যা করেছেন এবং তাঁকেও হত্যার চেষ্টা করেছেন। ঘটনার সময় হাসান নামে এক ব্যক্তি টিটুর সঙ্গে ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বালাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ তরফদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত টিটু পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোম্পানীগঞ্জে মাছ ধরা নিয়ে বিরোধে যুবক নিহত
কোম্পানীগঞ্জে পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে বিরোধের জেরে হামলায় আফতাব উদ্দিন (২৪) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁর চাচাতো ভাই জুয়েল আহমদকে (২৮) আটক করেছে পুলিশ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টার দিকে উপজেলার দুপরিরপাড় গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফতাবের মৃত্যু হয়। তিনি ওই গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুকুরের মালিকানা নিয়ে আফতাবের পরিবারের সঙ্গে তাঁর চাচা আব্দুল হালিমের ছেলেদের বিরোধ চলছিল। রোববার রাত সাড়ে ১২টার দিকে আফতাব ও তাঁর সহযোগী জাহাঙ্গীর আলম পুকুরে সেচ দিয়ে মাছ ধরছিলেন। এ সময় আফতাবের চাচাতো ভাইসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।
হামলায় আফতাব গুরুতর আহত হন। তাঁকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলমও আহত হয়েছেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজমান গণি জানান, পুকুর নিয়ে আফতাবের সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাইদের বিরোধ ছিল। মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে হামলার পর ভোরে আফতাবের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
জকিগঞ্জে ছেলের হামলায় মায়ের মৃত্যু, আহত চার
জকিগঞ্জে জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার দাবি ও টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ছেলের হামলায় গুরুতর আহত পিয়ারা বেগম (৬৩) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ ঘটনায় আড়াই বছরের শিশুকন্যাসহ পরিবারের আরও চার সদস্য আহত হয়েছেন।
পিয়ারা বেগম জকিগঞ্জ পৌর এলাকার পঙ্গবট গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের স্ত্রী। এ ঘটনায় তাঁর ছেলে সুমন আহমদকে (৩২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা গেছে, গত শুক্রবার টাকা ও জায়গা-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে সুমন তাঁর সৎমা কুটিনা বেগমকে (৪৫) লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এতে তাঁর চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে পিয়ারা বেগম সৎমা কুটিনা বেগমকে নিরাপত্তার জন্য তাঁর অপর ছেলে শাহীন আহমদের ঘরে রাখেন।
পরদিন শনিবার রাত প্রায় ১১টার দিকে সুমন আবারও পরিবারের সদস্যদের কাছে টাকা দাবি করেন এবং জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দিতে বলেন। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি লাঠি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালান। এতে পিয়ারা বেগম, কুটিনা বেগম, শাহীন আহমদ (৩৮), শাহিনের স্ত্রী শাহানা বেগম (৩২) এবং তাঁদের আড়াই বছরের মেয়ে ইসরাত জাহান গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার মধ্যরাতে পিয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সুমন কয়েক দিন ধরে টাকা দাবি করার পাশাপাশি বাড়ির জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, সুমন দীর্ঘদিন ধরে নেশাগ্রস্ত এবং নেশার টাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের চাপ দিতেন।
এ ঘটনায় সুমনের বড় ভাই শাহীন আহমদ বাদী হয়ে সুমন আহমদ ও অপর ভাই শামীম আহমদকে (৪৭) আসামি করে মামলা করেছেন। শাহীন জানান, হামলায় আহত তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সৎমা কুটিনা বেগমের চোখের আঘাতও গুরুতর। তিনিও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।
জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে সুমনকে তাঁর বসতঘর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার তাঁকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পিয়ারা বেগমের মৃত্যুর পর মামলায় হত্যা-সংক্রান্ত দণ্ডবিধির ধারা সংযোজন করা হবে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত। সুমনের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানান ওসি।
