সম্পাদকীয়:

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—দেশের ক্ষমতার পালাবদলে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসলেও, বাস্তবে তাদের রাজনৈতিক আচরণ ও কৌশলের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি পরিলক্ষিত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতির প্রচলিত ধারা নিয়ে এক ধরনের হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে—ইউরোপ বা আমেরিকার মতো একটি সুশাসিত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তা এখনো গড়ে ওঠেনি। ভোটারদের একটি অংশ এখনো ব্যক্তি, প্রভাব বা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ভালো-মন্দের পার্থক্য অনুধাবন না করেই বারবার একই ধরণের নেতৃত্ব নির্বাচিত হচ্ছে—যাদের মধ্যে কেউ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, কেউ আবার ক্ষমতার অপব্যবহারে অভ্যস্ত।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এই বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ভোট দিলেও, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি অংশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে অনেকের অজানা থাকলেও, নির্বাচনের পরও সেই অবস্থান থেকে সরে আসার প্রবণতা কম। ফলে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রায় সর্বস্তরে দলীয় সম্পৃক্ততা। সমাজের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। এতে করে নিরপেক্ষ নাগরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দলীয় পরিচয়ই হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বড় দলগুলো এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে কখনো অর্থ, কখনো জনপ্রিয়তার মোড়কে প্রার্থী নির্বাচন করে—যার ফলাফল হিসেবে অপরাধী বা বিতর্কিত ব্যক্তিরাও ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যায়।

নির্বাচনকে ঘিরে “ইঞ্জিনিয়ারিং” বা কারচুপির অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে শুধু অভিযোগ তুলেই দায় শেষ করা যায় না—এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা ও জনগণের সচেতনতার অভাবও সমানভাবে দায়ী। আরও উদ্বেগজনক হলো, নির্বাচনে পরাজয়ের পর কারচুপির অভিযোগ একটি ‘রুটিন’ বক্তব্যে পরিণত হয়েছে, যা প্রকৃত অনিয়মকে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করে।

নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও এখন আলোচনায়। উদাহরণ হিসেবে ‘ঘন ভোট’ ইস্যুতে সালাহউদ্দিন আহমেদ-এর পূর্বের অবস্থান ও পরবর্তী সময়ের পরিবর্তন রাজনৈতিক বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একইভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি—যেমন ৩১ দফা—বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনীহা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনআস্থা আরও কমিয়ে দেয়।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিজেদের বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেও, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এখনো পুরোপুরি সুস্পষ্ট নয়। কখনো তারা জোট রাজনীতির দিকে ঝুঁকে, কখনো স্বতন্ত্র অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এখনো তারা বিকল্প শক্তি হিসেবে পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্বের প্রশ্ন। তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিএনপি নতুনভাবে সংগঠিত হলেও, দলটির ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। একইভাবে খালেদা জিয়া-কে কেন্দ্র করে আবেগঘন রাজনীতি এখনো দলটির একটি বড় উপাদান। তবে ভবিষ্যতে বিএনপি কি পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় যেতে পারবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।

স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতির চরিত্রও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং দলবদলের প্রবণতা—এসবই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। ফলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য আদর্শের চেয়ে স্বার্থই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল সংকটটি কেবল দল বা নেতৃত্বের নয়—এটি একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন:

  • রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপ
  • প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
  • ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি
  • এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান

নইলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাস্তব পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে, আর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বারবার ভেঙে পড়বে।

দুলাল আহমদ

সহ-সম্পাদক

সুপ্রভাত সিলেট

 

By সুপ্রভাত সিলেট

সুপ্রভাত সিলেট (Suprobath Sylhet) একটি দৈনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সিলেটসহ সারাদেশের সর্বশেষ সংবাদ, স্থানীয় ঘটনা, জাতীয় খবর, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদ পাঠকদের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়াই এই সংবাদমাধ্যমের মূল লক্ষ্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকদের তথ্যসমৃদ্ধ রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে সুপ্রভাত সিলেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *