নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশ্বনাথ থেকে ফিরে :বাড়ির আশপাশে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০-১২ জন সদস্য ঘুরাফেরা করছেন। বাড়ির চারদিকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজনের আনাগোনা। তাদের হাতে দেশি অস্ত্র। এ বাড়িতে অপরিচিত কেউ প্রবেশ করতে চাইলে পড়তে হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদের। মুখোমুখি হচ্ছেন তিক্ত অভিজ্ঞতার। আবার কেউ-কেউ শিকার হচ্ছেন মারধরের। প্রায় ৫-৬ মাস ধরে প্রতিদিনই এমন চিত্র সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামধানা গ্রামের একটি বাড়ির। প্রশাসনের নজরদারিতে রাখা এ বাড়িটি র্যা বর হাতে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর। ইলিয়াস গুমে র্যা বর সংশ্লিষ্টার অভিযোগের নথিপত্র ২০২২ সালে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর থেকে এই অবস্থা চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের কারণে এ বাড়িতে (ইলিয়াসের বাড়ি) থাকা পরিবারের সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। সব সময় আতঙ্কে থাকেন। ইলিয়াস পরিবারের আতঙ্ক ছুঁয়ে গেছে রামধানা গ্রামের মানুষকে। তারাও আতঙ্কে-ভীতিকর একটা পরিবেশে দিনপার করছেন।
গত ১৬ জুলাই ২০২৩ সরেজমিনে রামধানা গ্রামে গিয়ে ইলিয়াস পরিবারের সদস্যদের দু:খ-দুর্দশার এবং হয়রানির চিত্র দেখা গেছে। সাথে প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিবেদক দুলাল আহমদ হামলার শিকার হয়েছেন।
সরেজমিনে দুলাল আহমদ যা দেখলেন ইলিয়াসের বাড়িতে : আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়ে ইলিয়াস পত্নী বহু আগেই এলাকা ছেড়েছেন সন্তানদের নিয়ে। তাদের বাড়িটি দেখাশুনার জন্য কিছু স্বজন সেখানে থাকতেন। কিন্তু তারাও শান্তিতে নেই। এমতাবস্থায় বাড়িতে থাকা লোকজন নানা হয়রানির পরও ঠিকে ছিলেন ইলিয়াসের স্মৃতিটুকু রক্ষার আশায়। বাড়িটিতে যখন যাচ্ছিলাম, বাড়ি পাশেই একদল যুবক আমাবে আমাকে থামান এবং পরিচয় জানতে চান। বাড়িতে ভাড়া নিতে যাচ্ছি বললে তারা ছেড়েদেন।
বাড়িতে থাকা কেয়ারটেকার পঞ্চাশোর্ধ রহিম মিয়া জানালে, দুইজন কর্মকর্তা লুকমান হুসাইন ও শামীম আহমেদ প্রায়ই বাড়িতে আসেন এবং কে আসছে, কে যাচ্ছে সে বিষয়ে খোঁজ–খবর নেন। তারা র্যা বের গাড়ি নিয়ে প্রায়ই আসেন। তারা র্যা বের বড় অফিসার বলে পরিচয় দিয়েছেন আমার কাছে। তারা (র্যা ব অফিসার) বেশিরভাগ ভাড়াটিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে মাঝে মাঝে তুলে নিয়ে যায় এবং র্যা ব-৯ এর অফিসে আটকে রাখে। পরে তাদের তখনই ছাড়া হয়, যখনই তারা প্রয়োজনীয় তথ্য দেন। এছাড়া ১০-১২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকের লোক প্রায়ই বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে থাকেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হয়রানি তো আছেই।
বাড়ির কেয়ারটেকার আরও জানান, র্যাবের লুকমান প্রায়ই তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং তিনি শীঘ্রই চাকরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি অনুরোধ করেন, ২৮ জুলাই ২০২৩ এর আগে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করতে, কারণ তিনি ওই সময়ের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেবেন।
ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যদের ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য জানতে চাইলে কেয়ারটেকার বলেন, তিনি কোনো তথ্য দিতে পারবেন না, কারণ পরিবারের সদস্যদের যে কোনো সাংবাদিক বা অন্য কেউ যোগাযোগ করলেই তারা হয়রানির শিকার হন। তাদের ওপর সব সময় নজরদারি রাখা হচ্ছে।
ঘণ্টাখানেক কেয়ারটেকার সাথে কথা বলার পর যখন ফিরছিলাম তখন ঐ যুবকেরা (ছাত্রলীগ ক্যাডার) আবার আমাকে পথে আটকায়। তারা আগে (ইলিয়াস আলীর বাড়িতে যাওয়ার সময়) যেখানে আমাকে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল সেখানে থামিয়ে দেহ তল্লাশি করে। তারা আমার নোট এবং সাংবাদিক আইডি পেয়ে তারা খুব খ্যাপে যান। আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করার পর লাঠি দিয়ে পিটাতে থাকেন এবং আমার মানিব্যাগ ও সাথে থাকা মোবাইল নিয়ে নেন। তাদের ব্যাপক মারধরে আমি আহত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তারা আমাকে রাস্তায় ফেলে চলে যায়। পরে পথচারীরা আমাকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

