সিলেট নগরীর হাওলাদারপাড়ার ‘মজুমদার টিলা’তে গুহা কেটে পরিকল্পিতভাবে টিলা ধসিয়ে মাটি পাচার ও দখলের অভিযোগ উঠেছে। বর্ষার মৌসুমে ভারী বৃষ্টিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে টিলা কেটে ফেলা হচ্ছে অভিনব কৌশলে, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘টিলাখেকো গুহা’ নামে পরিচিত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টিলার চারপাশে ব্যাপক ধসের চিহ্ন স্পষ্ট। টিলার ঢালে গড়ে উঠেছে একাধিক পাকা ভবন ও দোকানপাট। এর উত্তর-পশ্চিম কোণে প্রথমে একটি বড় গুহা ও পরে আরও কয়েকটি ছোট গর্ত কেটে টিলা দুর্বল করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে গুহাগুলোর পাশের মাটি ক্রমেই ধসে পড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক দশক ধরে মজুমদার টিলার মাটি গোপনে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। রাতের বেলা ট্রাকযোগে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়, যা শহর ও শহরতলির নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়। যদিও টিলার মালিক সুব্রত মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে সুইডেন প্রবাসী, তার হয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা টিলা প্লট করে বিক্রি করে আসছেন। প্রায় ১০ একর আয়তনের টিলাটির অধিকাংশ অংশ এখন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীর দখলে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্লট কিনে দেয়াল তোলার আগেই টিলার মাটি কেটে ভবন নির্মাণ উপযোগী করে দেওয়া হয়। মাটি বিক্রির টাকায় মূলত প্লটের দাম বুঝে নেওয়া হয় মালিকপক্ষের।
২০১৯ সালে এই টিলা কেটে প্লট তৈরি করায় পরিবেশ অধিদপ্তর একবার অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় ‘নীরব টিলা কাটা’। এবার চলছে আরও নতুন কৌশলে গুহা তৈরি করে ধস ঘটানোর কাজ।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, “টিলা কাটার প্রাথমিক সত্যতা পেলেও রাতে গোপনে কাজ হয় বলে কাউকে হাতেনাতে ধরা যায় না। আমরা টিলা মালিক ও সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। টিলা কাটার সময় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালানোরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, সিলেটের ১১ ভাগ ভূমিতে রয়েছে পাহাড়-টিলা, যার বড় অংশ বনাঞ্চল। কিন্তু গত এক যুগে টিলার সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০০৯ সালে যেখানে টিলা ছিল ১ হাজার ২৫টি, ২০২৪ সালে এসে তা কমে হয়েছে ৫৬৫টি।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সিলেট শাখার সদস্য সচিব আবদুল করিম চৌধুরী করিম কিম বলেন, “এই ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে প্রশাসনের আন্তরিকতা নেই। যেভাবে টিলা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে, তা অপরাধের শামিল। একদিন সিলেট পাহাড়-টিলাশূন্য হলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।”
