নিজস্ব প্রতিবেদক :
আমি পেশায় এক সিএনজি চালক। কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নই। দীর্ঘদিন এ পেশায় যুক্ত থাকায় শ্রমিকরা আমাকে সিলেট জেলা সিএনজি চালিত অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত করেছেন। যেহেতু শ্রমিকরা আমাকে নির্বাচিত করেছেন তাই তাদের দাবি দাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়টিও আমাকে দেখতে হয়। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থের পক্ষে থাকায় আমাকে প্রতিনিয়ত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও পুলিশ প্রশাসনের নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলার শিকার হতে হচ্ছে। সবশেষ ছাত্রলীগের হামলার শিকার হলেও পুলিশ আমাকে ও আমার সেক্রেটারিকে গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডে পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করেন। কোথাও ন্যায় বিচার পাচ্ছি না। আমি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও পুলিশ প্রশাসনের নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই।
গত ২০ জুলাই সিলেট জেলা কারাগার গেটে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে কথাগুলো বলছিলেন, সিলেট সিএনজি চালিত অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ শহিদ মিয়া। এসময় তার স্বজনরাও সাথে ছিলেন।
মোঃ শহিদ মিয়া তার শরীরে রিমান্ডে থাকাকালীন পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনায় দেশব্যাপী ডাকা শ্রমিক ধর্মঘট কর্মসূচি পালনকালে ১১ জুলাই ২০২৩ সিলেটে শ্রমিকসহ সড়কে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেই। কিন্তু হঠাৎ করে ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক চৌধুরীর নেতৃত্বে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে আমাকে ও শ্রমিক নেতা নিয়াজ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পুলিশ আমাকে ১ নম্বর আসামী করে একটি মামলা দিয়ে শ্রমিক নেতা নিয়াজ মোল্লাসহ আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত আমাদের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা এসআই জামাল আহমদ আমাকে ও শ্রমিক নেতা নিয়াজ মোল্লাকে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন চালান। গত ১৬ জুলাই আদালতে আমার জামিনের আবেদন করা হয়। জামিন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন আমাদের আদালতে তোলা হলে ম্যাজিস্ট্রেট স্যার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় ১৯ জুলাই জামিন শুনানির তারিখ ধার্য করেন। ১৯ জুলাই শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আদালত আমাদের জামিন মঞ্জুর করেন। ২০ জুলাই আমরা কারাগার থেকে মুক্তি পাই। কিন্তু মনের মাঝে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে কখন আবার হামলা-মামলা, নির্যাতনের শিকার হই।
মোঃ শহিদ মিয়া বলেন, ২০২২ সাল থেকে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল কর্মসূচির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতারা পরিবহন চালকদের প্রশাসনের মাধ্যমে চাপে রেখে রাস্তায় গাড়ি চালাতে বাধ্য করা শুরু করেন। হরতাল কর্মসূচিতে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা গাড়ি চালানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেই। এতে পুলিশ প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নেতারা আমার উপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেন। শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি এতে রাজি হইনি। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ হরতাল কর্মসূচিতে শ্রমিকরা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের না হওয়ায় আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয় আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের লোকজন। ওইদিন সিএনজি শ্রমিকরা গাড়ি না চালানোয় শ্রমিক লীগ নেতা মাশুক উদ্দিনের প্রভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে ও সংগঠনের সেক্রেটারিকে গ্রেপ্তার করে এক বছরের কারাদণ্ড দেন। এ মামলায় আপিল করে ২২ ডিসেম্বরে ২০২২ আমি ও সেক্রেটারি কারাগার থেকে মুক্তি এবং মামলা থেকে অব্যাহতি পাই। কারাগার থেকে বের হয়ে আমি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যাই। কিন্তু আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রশাসনের কারণে আমার ভাইয়ের স্বাভাবিক জীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠে। প্রায়ই রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় আমার গাড়িতে হামলা, আমাকে ধরে বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের অফিসে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করতো।
মোঃ শহিদ মিয়া আরও বলেন, জুন ২০২৩ সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন আনোয়রুজ্জামান চৌধুরী। আওয়ামী লীগের লোকজন আনোয়রুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষে প্রচারণার জন্য আমাদের বলেন। আমি এতে রাজি না হওয়ায় শ্রমিকরা প্রচারণায় অংশ নেয়নি। বিষয়টি জানাজানি হলে আমার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। ৫ মে ২০২৩ আনোয়রুজ্জামান চৌধুরীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক চৌধুরী আমাকে ফোন করে দেখা করতে বলেন। ৭ মে ২০২৩ আমি ওমর ফারুক চৌধুরীর সাথে দেখা করি। এসময় ওমর ফারুক চৌধুরী আমার রাজনৈতিক অবস্থান জানতে চান এবং প্রচারণায় কোনো অংশ নেয়নি তা জানতে চান। তাকে জানাই আমি রাজনীতির সাথে জড়িত নই। এ জন্য অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারি না। তখন ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক আমাকে তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য জোর প্রস্তাব দেন। এতে রাজি না হলে ওমর ফারুক চৌধুরী আমি হুমকি দিয়ে বলেন যে, আনোয়ারুজ্জামান নির্বাচিত জিতলে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আমার কমিটির কোনো চালক গাড়ি চালাতে পারবে না। পরবর্তীতে আনোয়ারুজ্জামন নির্বাচনে জয়ী হলে ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক চৌধুরী নানাভাবে পুলিশ প্রশাসন দিয়ে আমাকে হয়রানি, নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলায় আসামী করছেন।
