ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠা ১৯৭৭ সালে। সে সময় ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল ছাত্রসমাজের কাছে এক বড় প্রশ্নবোধক বিষয়। প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ও সুফল ব্যাখ্যা করতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হতো। মূলত এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই শিবিরের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি শহীদ মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
১৯৮৩ সাল। শিবির তখনও কৈশোর পেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিকাশের পথে। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। আমি তখন এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সংবাদ যখন আমরা পেলাম, তখন আমরা এতটাই আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম যে মনে হয়েছিল ইসলামী বিপ্লবের পথে আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে গেছি। তৎকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। নেতা-কর্মীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। শিবিরও তখন একটি নবীন সংগঠন। ১৯৮২ সালের সাংগঠনিক অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে দুই-তিন বছর সময় লেগেছিল। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃহত্তর সিলেটে তালতলায় এর প্রথম শাখা চালু হয়।
তখন দেশে এরশাদের সামরিক শাসনের কঠিন সময়। রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল নিষিদ্ধ । সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মাঝে-মধ্যে শিবিরের উদ্যোগে আকস্মিক মিছিল অনুষ্ঠিত হতো এবং আমরা নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে তাতে অংশগ্রহণ করতাম। সেই সময় ছাত্ররাজনীতিতে বামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। জাসদ ছাত্রলীগ ছিল বেশ সক্রিয়। ছাত্রদল তখনও নবীন, আর আওয়ামী ছাত্রলীগও তেমন শক্তিশালী ছিল না। এমন প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা, বামপন্থী সংগঠনগুলো সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রচার, প্রপাগান্ডা, বিষোদগার তখন তুঙ্গে। একপর্যায়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে তালতলা শাখায় হামলার ঘোষণা দেওয়া হয়। ব্যাংকের ম্যানেজার জনাব সৈয়দ আবু নসর সাহেবের হাউজিং এস্টেটের বাসভবনেও হামলার হুমকি দেওয়া হয়।
এসব সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলার মতো সাংগঠনিক শক্তি তখন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছিল না। তারপরও দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে ইসলামী ব্যাংক রক্ষায় শিবির এগিয়ে আসে। সম্ভাব্য হামলার দিনগুলোতে দলবদ্ধভাবে সারাদিন তালতলা শাখার সামনে অবস্থান করে শিবির পাহারা দিয়েছিল। এমনকি রাতের বেলায় ম্যানেজার সাহেবের বাসভবনেও পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, ইসলামী ব্যাংক রক্ষায় যারা সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশেরই ব্যাংকে হিসাব খোলার বা অর্থ জমা রাখার সামর্থ্য ছিল না। ছাত্রজীবনে আমাদের কারও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। যারা জীবনবাজি রেখে ব্যাংক রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিলেন, পরবর্তী জীবনেও তাঁরা ব্যাংক থেকে বিশেষ কোনো সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে মনে করার কারণ নেই। কেবল বিশ্বাস, আদর্শ ও আবেগের তাড়নায় আমরা কয়েকজন নিজের পকেটের টাকা বাঁচিয়ে পরবর্তীতে এক হাজার টাকা মূল্যের এক একটি শেয়ার কিনেছিলাম।
১৯৯০ সালে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পর একটি হাসপাতালের শেয়ার কেনার উদ্দেশ্যে এক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ সুবিধার জন্য ইসলামী ব্যাংক তালতলা শাখায় গিয়েছিলাম। ম্যানেজার সাহেব জানালেন, এ পরিমাণ অর্থের জন্য শহরের কোনো সম্পত্তি মর্টগেজ দিতে হবে। আমাদের শহরে কোনো বাড়ি ছিল না, আর এমন কোনো সামর্থ্যবান পরিচিতজনও ছিলেন না যিনি সহযোগিতা করতে পারতেন। ফলে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। জীবনবাজি রেখে যে ব্যাংক পাহারা দিয়েছিলাম, সেখান থেকে এভাবে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার বেদনা আজও স্মৃতিতে অম্লান।
পরে ইসলামী ব্যাংক বিশ্বনাথ শাখার ম্যানেজার, আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ জিল্লুল হক ভাইয়ের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করি। তিনি আজ পৃথিবীতে বেছে নেই। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক। সে সময় ব্যক্তিগত গ্যারান্টারের মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ সুবিধা পাওয়া যেত। তিনি আমার ও আমার স্ত্রীর নামে মোট ৫০ হাজার টাকার ব্যবস্থা করে দেন। সেই অর্থ দিয়ে আমি পূর্বাশা পলি ক্লিনিকের শেয়ার ক্রয় করি।
১৯৯৫ সালের দিকে সিলেট এক্স-রে অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জন্য একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন কেনার উদ্দেশ্যে আবার ইসলামী ব্যাংকের দ্বারস্থ হই। স্থানীয় শাখা থেকে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল হাশেম চৌধুরীসহ আমরা মতিঝিল প্রধান কার্যালয়ে ছয় লক্ষ টাকার বিনিয়োগের জন্য যাই। কিন্তু প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও মর্টগেজের শর্ত পূরণ করতে না পারায় সে সময়ও ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থায়ন নিতে পারিনি। পরে সোশ্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক আমাদেরকে সেই অর্থায়নের ব্যবস্থা করে।
বাংলাদেশে ইসলামী অর্থব্যবস্থার পথিকৃৎ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পর তিন দশকেরও বেশি সময়ে আরও বহু ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আজ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ধারণা মানুষের কাছে সুপরিচিত। ইসলামের দাওয়াতি কাজে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে আগের মতো কষ্ট করতে হয় না। এটিই দায়ীদের অন্যতম বড় সফলতা।
ইসলামী ব্যাংক হচ্ছে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের ঈমান, আদর্শ এবং আবেগের স্থান।। ইসলাম প্রিয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পরিসমাপ্তি হয়েছিল এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আজ উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনৈতিক কালিমা লেপন করে এই ব্যাংকের ধ্বংস প্রক্রিয়া দেশ ও জাতির জন্য চরম আত্মঘাতী হবে।
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমানে যা ঘটছে, তা দেশ, জাতি এবং আমাদের সকলের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। সময়ের প্রবাহে অনেক ইতিহাস হারিয়ে যায়। ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের কিছু স্মৃতি সংক্ষেপে পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ইসলামী ব্যাংকের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক নয়; এটি বিশ্বাস, আদর্শ ও আবেগের সম্পর্ক। আজকের প্রজন্ম আশা করি ঐতিহাসিক এই বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম হবে।
স্মৃতির টান
কয়েক সপ্তাহ আগে তৎকালীন ব্যাংক ব্যবস্থাপক জনাব সৈয়দ আবু নসর সাহেবের ছেলে আমাকে ফোন করেছিল। সপরিবারে তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। বয়সের ভারে জনাব আবু নসর সাহেব আজ অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। তবুও সাড়ে তিন যুগেরও বেশি সময় পর তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন। ফোনে আমরা বেশ কিছুক্ষণ অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করলাম। পারস্পরিক পারিবারিক খোঁজখবর নিলাম। তখনকার সময়ে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের বাসা বাড়ি ছিল হাতে গোনা। প্রখ্যাত মুফাসসির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব যখন সিলেটে তাফসির মাহফিলে আসতেন, বহুবারই আবু নসর সাহেবের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। আমরা তখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতাম। সেই দিনগুলোর কথা তাঁর সঙ্গে ভাগাভাগি করতে করতে যেন কিছু সময়ের জন্য আবার সেই অতীতে ফিরে গিয়েছিলাম।
সেই অতীত ছিল বিশ্বাস, আদর্শ ও আবেগে ভরপুর। সময়ের প্রবাহে সেই দিনগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। জীবনের হিসাব-নিকাশ দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করি—তিনি যেন আমাদের সবাইকে সবসময় তাঁর পথে পরিচালিত করেন এবং ঈমানের উপর অটল রাখেন।
– সমাপ্ত –
