নিজস্ব প্রতিবেদক:
গোধূলির আলোয় গা ধুয়ে নেয়া এক শান্তিপূর্ণ গ্রাম মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার গোয়ালী। সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা মোহাম্মদ শামিম আহমেদের। বয়স মাত্র ৩৮, পিতা আব্দুল কাইয়ুম। জীবনের প্রতিটি ধাপে ন্যায়বোধ আর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়েছেন তিনি। সেই চেতনা থেকেই তিনি যুক্ত হন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বড়লেখা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু যার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যার অধিকার রক্ষায় কলম ধরেছিলেন, সেই সমাজই একদিন তাকে নিঃসঙ্গ ও নিরাপত্তাহীন করে তুলবেÑএমন শঙ্কা ছিল না তার।
শামিম আহমেদের বিরুদ্ধে রুষ্ট হয়ে উঠে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি। অভিযোগ, বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক আবু বক্কর ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী তার পৈত্রিক জমি জোরপূর্বক দখল করার চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় শামিম বাদী হয়ে মৌলভীবাজার আদালতে একটি স্বত্ত্ব মামলা করেন। তবে নিজের জমি নিয়ে মামলা করায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন আওয়ামী লীগ নেতা বক্কর। জমি নিয়ে শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্ব দ্রুত রূপ নেয় সহিংসতায়।
১ সেপ্টেম্বর ২০২১ আওয়ামী লীগ নেতা আবু বক্করের নেতৃত্বে শামিমের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তালা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে, শামিমের বাবা-মাকে নির্যাতন করে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। পাশাপাশি মামলা তুলে না নিলে শামিমের স্ত্রী রুজি বেগম ও তার শিশু কন্যা সামিরা বেগমকে অপহরণ এবং ধর্ষণ করবে বলে হুমকি দেয়। পরবর্তীতে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে দিনদুপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক আবু বক্কর ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক মারধরের শিকার হন শামিম আহমেদ। তবে হামলাকারীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, আবু বক্কর এবং তার অনুসারীরা শুধুমাত্র জমি দখলেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং শামিমের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানবাধিকারমূলক কর্মকাণ্ডেও বাধা হয়ে দাঁড়ান। বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকি ও হয়রানির শিকার হয়ে পড়ে শামিম ও তার পরিবার। আশ্রয় চায় প্রশাসনের কাছে, কিন্তু নিরব থাকে কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকার কর্মী হয়েও নিজের অধিকারের সুরক্ষা না পেয়ে, অবশেষে একদিন স্ত্রী-সন্তানসহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শামিম আহমেদ।
শামিমের বাবা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আমাদের নিজস্ব ভূমি দখলে নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা জঘন্য সব কার্যক্রম করছেন। আমাদের বাড়িতে হামলা-নির্যাতন করছেন, হুমকি দিচ্ছেন। কোথাও ন্যায় বিচার পাচ্ছি না আমরা। এমন পরিস্থিতিতে আমার ছেলে সম্মান ও প্রাণ বাঁচাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রিয় স্বদেশ ছেড়ে প্রবাসে আশ্রয় নিয়েছে।
শামিমের এই বিদায় ছিল না কোনো স্বপ্নের পেছনে ছোটা। এটা ছিল এক প্রকার নির্বাসন -নিজভূমে পরবাসীর মতো অবস্থার বিরুদ্ধে নিঃশব্দ প্রতিবাদ। শামিম আহমেদ আজ দেশের বাইরে, অজানা এক আশ্রয়ে।
একজন তরুণ মানবাধিকার কর্মী যখন নিজ দেশেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, তখন প্রশ্ন ওঠে -এই রাষ্ট্র কার? যখন পৈত্রিক জমির জন্য দাঁড়াতে গিয়ে রাজনৈতিক বাহিনীর হাতে নিপীড়িত হতে হয়, তখন বিবেক কাঁদে ন্যায়বিচার কোথায়?
শামিম আহমেদের এই বাস্তবতা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয় -এটা একটি সমাজব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ন্যায়বিচার এখনও শক্তির মুখাপেক্ষী। আর এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে হয়তো আরও অনেক শামিমকে নিজভূমে পরবাসী হয়ে উঠতে হবে।
