নিজস্ব প্রতিবেদক :

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার (ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা) মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও সেবা গ্রহীতাগণকে অযথা হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি এমন অভিযোগে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন বড়লেখার প্রতিনিধি আবু হাসান, ভুক্তভোগী হুমায়ুন কবির, জাহেদুর রহমান জাহেদ, জাহাঙ্গীর হোসেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক বরাবরে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

লিখিত অভিযোগের অনুলিপি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বড়লেখা সদর ভূমি অফিসের তহশিলদার রীতিমতো ফাঁদ পেতে ঘুষ আদায় করছেন। ভূমি মালিকদের সঙ্গে রফাদফা হলেই যৎসামান্য ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ কাটেন। তার ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপারে একাধিকবার ভুক্তভোগী ভূমি মালিকগণ জেলা প্রশাসক, মৌলভীবাজার বরাবর অভিযোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ছাত্রজনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পরেও তিনি দুর্দান্ত প্রতাপে তার অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এসব অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও রহস্য জনক কারণে তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ভুক্তভোগীরা জানান, বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মজিদ মিয়া খাজনা দিতে আসা লোকদের নানা অজুহাতে হয়রানি করেন। ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ে নামজারি পর্চা ও খাজনা পরিশোধের রশিদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় খাজনা পরিশোধ করতে গেলে প্রথমে বিরাট অঙ্কের টাকার সমন্বয় করে দেন। এরপর দর কষাকষির পর যৎসামান্য টাকার ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করেন। সারাদেশের অন্যান্য উপজেলায় ‘আগে নামজারি পরে খাজনা’ পরিশোধের নিয়ম থাকলেও মজিদ মিয়া বড়লেখায় যোগদান করেই এসিল্যান্ডকে প্রভাবিত করে ‘আগে খাজনা পরে নামজারি’ প্রথা চালু করেন। আবেদনকারীগণের খাজনা পরিশোধ করা না থাকলে এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসকের দোহাই দিয়ে তিনি নামজারি রিপোর্ট নেতিবাচক প্রদান করেন। ভুক্তভোগী অনেকেই অভিযোগ করেন সামান্য কয়েক শতক ভূমি ক্রয় করার কারণে বাধ্য হয়ে তাদের আগের ভূমি মালিকের বকেয়া ৩০-৪০ বছরের সমস্ত খতিয়ানের কয়েক একর ভূমির খাজনা দিতে হয়। আবার তার চাহিদামত টাকা দিয়ে দিলে খাজনা ছাড়াও তিনি নামজারি রিপোর্ট প্রদান করেন।

ঘুষের বিনিময়ে পরিবর্তন করেন জলমহালের রিপোর্ট: সরকারি জলমহালের ইজারা প্রদানের নিকটবর্তী রিপোর্ট অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায় বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে। এই বিষয় নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও তার বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, অভিযোগকারী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি ভূমি অফিসে তার পিতার নামীয় ভূমির নামজারি করতে যান (যার আবেদন নম্বর ৩০৪১১৩৭ ), নামজারি মামলা নম্বর ১৮৮/২৪-২৫। কিন্তুতহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়া হুমায়ুন কবিরের আবেদনে সকল ডকুমেন্টস সঠিক থাকার পরেও হয়রানি করে ঘুরাতে থাকেন। এরপর নানা ভুল দেখিয়ে নামজারি আবেদন বাতিলের প্রস্তাব সহকারী কমিশনার (ভূমি), বড়লেখা বরাবর প্রেরণ করেন। তার মিথ্যা-হয়রানিমূলক রিপোর্টের কারণে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহোদয় আমার নামজারি আবেদন বাতিল করেন। পরবর্তীতে হুমায়ুন কবির আবেদনটি বিবেচনা করার জন্য হালনাগাদ আবেদন দাখিল করেন। আবেদনটি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কাছে গেলে তিনি পুনরায় যাচাই-বাচাই করে দেখেন আবেদনে কোনো ত্রুটি নেই। নামজারি আবেদনটি সঠিক ছিল। পরে এসিল্যান্ড মহোদয় আবার নামজারি আবেদনটি সক্রিয় করে পুনরায় তহশিলদার এর কাছে পাঠিয়ে পুনঃতদন্ত রিপোর্ট এনে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি নামজারিটি সম্পন্ন করে দেন।

ভুক্তভোগী হুমায়ুন কবির বলেন, শুধুমাত্র অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য হয়রানিমূলক মিথ্যা রিপোর্ট প্রদান করে ২৮ দিনের নামজারির জন্য আমাদের প্রায় ০৭ (সাত) মাস অযথা হয়রানি করেন তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়া। তিনি এভাবেই সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আমরা এর জন্য সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

অপরদিকে জাহেদুর রহমান জাহেদ বলেন, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল আমার নিজ গ্রাম বড়লেখা সদর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মহদিকোনায় ৩টি এক্সেভেটর ও ৬/৭টি ট্রাক্টর দিয়ে অবৈধভাবে ফসলি কৃষি জমির মাটি কেটে পরিবহন করতে দেখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আসলাম সারোয়ার মহোদয়কে অবগত করি। ঘটনা স্থলের ভিডিও এবং ছবি উনার হোয়াটসঅ্যাপে প্রেরণ করি। তিনি সরকারি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে বড়লেখা সদর ইউনিয়নের তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়াকে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু মোহাম্মদ মজিদ মিয়া পথিমধ্যে মাটি কর্তনকারীদের সাথে যোগসাজসে তাদেও বিষয়টি অবহিত করে ঘটনাস্থল থেকে নিরাপদে চলে যেতে বলেন এবং এসিল্যান্ড মহোদয়কে গিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জানান, এখানে মাটি কাটার কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। আমাকে এসিল্যান্ড মহোদয়ের নিকট মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেন। অন্যদিকে অবৈধ মাটি কর্তনকারীগণ প্রচার করে বেড়ান সদর তহশিলদার মজিদ মিয়া তাদের লোক। তাদের কাজে কেউ বাধা দেওয়ার নেই।

জাহেদুর রহমান জাহেদ আরও বলেন, মজিদ মিয়ার এভাবে অপরাধীদের সাথে আতাত করে চলা, সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং অপরাধীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলার কারণে সমাজের প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীরা আরও অন্যায় কাজ করার সাহস পাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে এসিল্যান্ড-ইউএনও-ডিসি মহোদয়সহ প্রশাসন/সরকারের বদনাম হচ্ছে। আমরা উনার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানাচ্ছি।

অপর ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমার এক আত্মীয় নাজমরির আবেদন করার পর বারবার নামজারি রিপোর্ট এর জন্য বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার এর সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তিনি নামজারি রিপোর্ট প্রদান না করে আমাকে দিনের পর দিন ঘুরাতে থাকেন। আমার সকল কাগজপত্র অনলাইনে সাবমিট করে আবেদন করার পরও আমাকে দলিলপত্রের ফটোকপি পুনরায় তার কাছে জমা দিতে বলেন। আমি কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তিনি রিপোর্ট না দিয়ে আমাকে হয়রানি মূলকভাবে ঘুরাতে থাকেন। একপর্যায়ে এপ্রিল মাসে এসে তিনি জানান কাগজপত্র মূল কপি থেকে স্ক্যান করে আপলোড না করার কারণে নামজারি বাতিলের জন্য এসিল্যান্ড মহোদয়ের নিকট রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন। আমাকে নতুনভাবে আবেদন করতে বলেন।

জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, আমি জানুয়ারি মাসে ফের আবেদন করি। আমার কাগজপত্র ঠিক না থাকলে এরমধ্যে আমাকে তিনি জানাতে পারতেন। আমি সাথে সাথে নতুন করে আবেদন করতে পারতাম। আমাকে ০৩ মাস অযথা হয়রানি করা হয়। উনার কথামতে আমি আবার নতুন করে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল আবেদন দাখিল করি। যার আবেদন নং ৩৩৬৬৫৯৯, নামজারি কেস নং ৬৩৯১/২০২৪-২৫। নতুন নামজারির রিপোর্ট এর জন্য আবার বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মজিদ মিয়া আবারও আমাকে হয়রানি করেন। তিনি আবারও আমাকে দলিলপত্রের ফটোকপি উনার কাছে জমা দিতে বলেন। আমি আমার আগের একই ভূমির আবেদনে দলিলপত্রের ফটোকপি উনার কাছে জমা দিয়েছিলাম। একথা বললে উনি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন এবং কাগজপত্রের ফটোকপি উনার কাছে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক বলে জানান। বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার অযথা আমাদেরকে হয়রানি করেন। তার এরকম হয়রানির কারণে সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। সাধারণ জনগণ তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা বড়লেখার সাধারণ ভুক্তভোগী জনগণের পক্ষ থেকে বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার এসব স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম-দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছি।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত বড়লেখায় সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার (ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা) মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তিনি ফোন না ধরায় তার উপর উঠা অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

By সুপ্রভাত সিলেট

সুপ্রভাত সিলেট (Suprobath Sylhet) একটি দৈনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সিলেটসহ সারাদেশের সর্বশেষ সংবাদ, স্থানীয় ঘটনা, জাতীয় খবর, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদ পাঠকদের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়াই এই সংবাদমাধ্যমের মূল লক্ষ্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকদের তথ্যসমৃদ্ধ রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে সুপ্রভাত সিলেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *