বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো বর্তমানে শিল্পবর্জ্য, পৌরবর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ হুমকির মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের প্রায় সব প্রধান নদীতেই দূষণের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী দেশের সবচেয়ে দূষিত তিন নদীর মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের সুতাং নদী, গাজীপুরের লবণদহ নদী এবং নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদী।
২০২৩ সালে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) দেশের ৫৬টি প্রধান নদ-নদীর ওপর এক বছরব্যাপী গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণায় নদীর পানির জারক প্রকৃতি, দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও), জৈব অক্সিজেনের চাহিদা (বিওডি) এবং রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা (সিওডি) পরিমাপের মাধ্যমে দূষণের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, শুধু শহরাঞ্চল নয়, প্রত্যন্ত এলাকার নদীগুলোও এখন দূষণের শিকার।
গবেষকদের মতে, শিল্পায়নের বিস্তার এবং অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে দূষণ দেশের প্রায় সব নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর প্রবাহমান স্রোতের কারণে এক নদীর দূষণ অন্য নদীতেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় সবচেয়ে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত লবণদহ, হাঁড়িধোয়া ও সুতাং নদীর পানির মান প্রায় একই রকম নিম্ন পর্যায়ের। এ নদীগুলোর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম পাওয়া গেছে, যা জলজ প্রাণীর টিকে থাকার জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য পানিতে কমপক্ষে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন।
সুতাং নদীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ উপস্থিতি
বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী সুতাং হবিগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। প্রায় ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী একসময় খরস্রোতা ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল। তবে বর্তমানে নদীটি গুরুতর পরিবেশ দূষণের শিকার।
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুতাং নদীর মাছ ও পানিতে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। নদী থেকে সংগ্রহ করা ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, বড় আকারের মাছের শরীরে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি, কারণ তারা দীর্ঘ সময় ধরে দূষিত পরিবেশে বসবাস করে।
নদীর পানির নমুনা বিশ্লেষণে প্রতি লিটারে ৬ থেকে ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এসব কণার মধ্যে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট (PET) এবং পলিআমাইডের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে, যা মূলত শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের অবশিষ্টাংশ থেকে এসেছে।
এছাড়া সুতাং নদীর পানিতে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার মতো ভারী ধাতুর মাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি এবং উচ্চমাত্রার দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের কারণে নদীটির পানি ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’-এ অত্যন্ত নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন ভাটির অংশে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ সুতাং নদীর পরিবেশগত সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
লবণদহ ও হাঁড়িধোয়ার করুণ অবস্থা
গাজীপুরের লবণদহ নদী একসময় প্রবাহমান নদী হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে এটি অনেকাংশে খাল বা নালায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদী, যা একসময় কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন দখল ও শিল্পবর্জ্যের কারণে প্রায় প্রাণহীন। স্থানীয়দের মতে, নদীটিতে এখন মাছ পাওয়া যায় না এবং এর পানি পশুপাখির ব্যবহারেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের নদীগুলোকে রক্ষা করতে হলে শিল্পবর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নদীদূষণবিরোধী আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। অন্যথায় নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।
