দীর্ঘ সময় ধরে অলরাউন্ডার হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে রাজত্ব করেছেন সাকিব আল হাসান। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে পরিচিত করানোর অন্যতম বড় ব্র্যান্ড তিনি। অথচ সেই মহাতারকাই আজ নিজ দেশে ফিরতে পারছেন না। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার দেশে ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে নতুন সরকার আসার পর আবারও আলোচনায় সাকিবের প্রত্যাবর্তন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশের মাটিতে সাকিবের ফেরা অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়ে যায়। জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে হওয়া হত্যা মামলা, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি এবং আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তাকে গভীর সংকটে ফেলে দেয়। বাস্তবতায় পরিণত হয় এক নির্মম সত্য—বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকাই নিজ দেশেই হয়ে পড়েন ‘পরবাসী’।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও দেখা দিচ্ছে নতুন আশার আলো। সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সাকিবের ফেরা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকার সাকিব ও মাশরাফি বিন মর্তুজা-র বিষয়ে ‘নমনীয় অবস্থান’ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের বরপুত্র সাকিব আজ যেন এক ট্র্যাজিক হিরো। মাঠের বীরত্বের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে আদালত, রাজনীতি আর বিতর্কের মারপ্যাঁচ। এক যুগের বেশি সময় ধরে লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরা এই ক্রিকেটার আজ নিজ ভূমিতেই নির্বাসিতের মতো জীবন কাটাচ্ছেন। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া এবং জাতীয় সংকটে নীরবতা তাকে ঠেলে দিয়েছে তীব্র জনরোষের মুখে।
ভক্তদের প্রশ্ন—বাইশ গজের এই মহানায়ক কি শেষ পর্যন্ত আইনি বেড়াজালেই আটকে থাকবেন? তার রেকর্ডগড়া ক্যারিয়ারের শেষটা কি তবে বিদেশের মাটিতেই লেখা হবে?
গত কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেললেও তার মন পড়ে আছে মিরপুরের চেনা উইকেটে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের মাধ্যমে ঘরের মাঠে বিদায়ের পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি ও জনরোষের আশঙ্কায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। এ প্রসঙ্গে সাকিব নিজেই বলেছিলেন,
“ক্রিকেট বোর্ড যদি আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে সেটা তাদের ব্যর্থতা। এখানে আমার কী করার আছে?”
তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাও দীর্ঘ ও গুরুতর। জুলাই–আগস্টে দেশে না থাকলেও তার নামে হত্যা মামলা হয়। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর তদন্তে শেয়ারবাজার কারসাজি, অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ সামনে আসে। আইএফআইসি ব্যাংক-এর চেক জালিয়াতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবরও আসে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) পরিচালক আসিফ আকবর জানিয়েছেন, সাকিবের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে এবং মামলার ফাইলগুলো ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সাকিবের স্বপ্ন ছিল দেশের মাটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে রাজকীয় বিদায় নেওয়া। বিসিবি ও সরকারের সাম্প্রতিক নমনীয় অবস্থান সেই স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। জাতীয় দলে ফেরার বিষয়টি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজের ওপর।
সাকিবের ফেরা মানে কেবল একজন ক্রিকেটারের ফেরা নয়—এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় বিতর্কের অবসান।
একদিকে আইনি জটিলতা ও জনরোষের কঠোর বাস্তবতা, অন্যদিকে দেশের হয়ে শেষবার মাঠে নামার আবেগঘন স্বপ্ন—এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে সাকিব আল হাসান।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন,
“আমি এখনো অবসর নিইনি। আপনারা অনেক দূর চিন্তা করে ফেলেছেন। আগে আমাকে দেখতে দিন সামনের দিনগুলোতে কী হয়।”
