সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর, শাহ আরেফিন টিলাসহ জেলার ছয়টি প্রাকৃতিক অঞ্চলকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, এসব এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় শিগগিরই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ইসিএ ঘোষণার প্রস্তাব পাওয়া অন্য এলাকাগুলো হলো রতনপুর, উত্তমছড়া, লোভাছড়া, শ্রীপুর ও লালাখাল। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় অবাধে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইসিএ ঘোষণা কার্যকর হলে এসব এলাকায় বালু-পাথর লুটপাট বন্ধ করা সহজ হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, শুধু ইসিএ ঘোষণা করলেই চলবে না; কার্যকর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

এর আগে ২০১৫ সালে সিলেটের জাফলংকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলেও সেখানে আজও অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। ফলে নতুন করে ঘোষণার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার সিলেটের কয়েকটি কোয়ারি থেকে বৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ করে। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও অবৈধ উত্তোলন থামেনি। বরং বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে এসব এলাকায় প্রকাশ্যে পাথর লুটের অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর গত কয়েক বছরে অবাধ পাথর উত্তোলনের কারণে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানে নজিরবিহীনভাবে পাথর লুট শুরু হয়। ধলাই নদীর উৎসমুখে অবস্থিত এই পর্যটন এলাকা এখন প্রায় পাথরশূন্য।

শাহ আরেফিন টিলার অবস্থাও একই রকম। সরকারি খাস খতিয়ানের প্রায় ১৩৭ দশমিক ৫০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই টিলায় একসময় বড় আকারের দুটি উঁচু পাহাড়ি গঠন ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের নির্বিচার পাথর উত্তোলনে সেই টিলার অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন। সেখানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বড় গর্ত।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রস্তাবিত এলাকাগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ মূল্যায়ন এবং ইসিএ ঘোষণার সম্ভাব্য সীমানা নির্ধারণে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইসিএ ঘোষণার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিবেশকর্মীরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও তারা সতর্ক করে বলেছেন, জাফলংয়ের মতো যেন এসব এলাকাও কেবল কাগজে-কলমে সংরক্ষিত না থাকে।

‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট জেলা শাখার সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, জাফলং-ডাউকি নদীর দুই তীরের ৫০০ মিটার এলাকা ইসিএ ঘোষণার পরও সেখানে অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হয়নি। তাই নতুন ঘোষণার ক্ষেত্রেও কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোগটি দেরিতে নেওয়া হচ্ছে। শাহ আরেফিন টিলার মতো কিছু এলাকা ইতোমধ্যে এমনভাবে ধ্বংস হয়েছে যে, এখন সেগুলোর জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির এক রিট আবেদনের পর ২০১৪ সালে হাইকোর্ট সিলেটের পাথর খাদগুলোতে যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন। পরে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট আবারও জানতে চান, জাফলং, শাহ আরেফিন টিলা, ভোলাগঞ্জ, উত্তমছড়া, শ্রীপুর, বিছনাকান্দি ও লোভাছড়ায় ধ্বংসাত্মক পাথর উত্তোলন বন্ধে ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এসব এলাকাকে ইসিএ ঘোষণা করা হবে না।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো এলাকাকে ইসিএ ঘোষণা করে সেখানে প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস, ভূমির গঠন পরিবর্তন, দূষণকারী শিল্প স্থাপন, বর্জ্য নিঃসরণ এবং পাথরসহ অন্যান্য খনিজ উত্তোলনের মতো কার্যক্রম সীমিত বা নিষিদ্ধ করতে পারে।

বর্তমানে দেশে ১৩টি এলাকা ইসিএ ঘোষণার আওতায় রয়েছে। সরকার বলছে, সিলেটের আরও কয়েকটি পাথরসমৃদ্ধ অঞ্চলকে এই তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

By সুপ্রভাত সিলেট

সুপ্রভাত সিলেট (Suprobath Sylhet) একটি দৈনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সিলেটসহ সারাদেশের সর্বশেষ সংবাদ, স্থানীয় ঘটনা, জাতীয় খবর, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদ পাঠকদের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়াই এই সংবাদমাধ্যমের মূল লক্ষ্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকদের তথ্যসমৃদ্ধ রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে সুপ্রভাত সিলেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *