পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় শুধু একটি দলের ক্ষমতাচ্যুতি নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি পুরোনো কিন্তু মৌলিক সত্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—দল ও সরকার একাকার হয়ে গেলে পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতার পূর্বাভাস বহু আগেই দিয়েছিলেন প্রয়াত বাম নেতা Buddhadeb Bhattacharjee। ২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসানের পর তিনি বলেছিলেন, সরকার ও দল যখন মিশে যায়, তখন সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয় এবং দল সংগঠনগত শক্তি হারায়। তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক পরাজয় যেন সেই সতর্কবার্তারই পুনরাবৃত্তি।

গণতন্ত্রে জনগণ একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য। কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই দল আর শুধু নিজের সমর্থকদের নয়, পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানেই দল ও সরকারের মৌলিক পার্থক্য। দল রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সংগঠন নিয়ে কাজ করবে, আর সরকার পরিচালিত হবে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের স্বার্থে। এই সীমারেখা মুছে গেলে সরকার দলীয়করণের শিকার হয়, প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে, আর জনগণের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে।

উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে দল ও সরকারের এই পৃথক অবস্থান সুস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে Donald Trump রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও দলীয় সংগঠন পরিচালনা করে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি। যুক্তরাজ্যে Keir Starmer সরকারপ্রধান, আর লেবার পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বে আছেন Anna Turley। ভারতে Narendra Modi সরকারপ্রধান হলেও দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব আলাদা কাঠামোয় পরিচালিত হয়। এই বিভাজন কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, কার্যকরও।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তি মনে করতে শুরু করেন। প্রশাসনে হস্তক্ষেপ, থানায় তদবির, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য—এসবের মাধ্যমে দল সরকারকে গ্রাস করে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, আর দলও জনআস্থা হারায়। রাজনৈতিক কর্মসূচির জায়গা দখল করে ব্যক্তিস্বার্থ, প্রভাব বিস্তার আর সুযোগসন্ধানী সংস্কৃতি।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ভরসা জনগণ থেকে সরে গিয়ে আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সমালোচনা সহ্য করার পরিবর্তে শুরু হয় ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার। ফলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, সরকার বিচ্ছিন্ন হয়, আর সংগঠন ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ে। ইতিহাস বলে, এ ধরনের শাসনের শেষ সাধারণত আকস্মিক নয়—ধীরে ধীরে জমে ওঠা জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণেই তার পরিণতি ঘটে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এখানে বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতায় গিয়েই দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা মুছে যায়। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার, সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে।

যে কোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই—তারা কি দল ও সরকারকে আলাদা রাখতে পারবে? দল কি সংগঠন হিসেবে জনগণের সঙ্গে থাকবে, নাকি সরকারকে গিলে খাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে ক্ষমতার স্থায়িত্ব, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের সম্পর্ক হওয়া উচিত রেললাইনের মতো—পাশাপাশি চলবে, কিন্তু একে অপরকে গ্রাস করবে না। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই সরকার কার্যকর হয়, দল শক্তিশালী থাকে, আর গণতন্ত্র টেকসই হয়। না হলে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল আবারও প্রমাণ করবে—দল যখন রাষ্ট্র হয়ে উঠতে চায়, তখন পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

By সুপ্রভাত সিলেট

সুপ্রভাত সিলেট (Suprobath Sylhet) একটি দৈনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সিলেটসহ সারাদেশের সর্বশেষ সংবাদ, স্থানীয় ঘটনা, জাতীয় খবর, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদ পাঠকদের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়াই এই সংবাদমাধ্যমের মূল লক্ষ্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকদের তথ্যসমৃদ্ধ রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে সুপ্রভাত সিলেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *