হবিগঞ্জের সুতাং নদ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের শিকার হয়েছে। নদীর মাছ ও পানিতে বিপজ্জনক মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হকৃবি) সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই তথ্য।
গবেষণায় নদী থেকে সংগ্রহ করা ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, ছোট মাছের তুলনায় বড় মাছের শরীরে দূষণের মাত্রা বেশি, যা দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে বসবাসের ফল।
নদের পানিতেও বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রতি লিটার পানিতে ৬ থেকে সর্বোচ্চ ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব কণার গড় আকার শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার। রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ও পলিআমাইডের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকজাত পণ্য থেকেই এসব দূষণ ছড়াচ্ছে।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, সুতাং নদীর পানিতে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার মতো ভারী ধাতুর মাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কম এবং মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকায় ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী নদীর পানি অত্যন্ত নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন ভাটির দিকে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
তাঁদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সুতাং নদীর পরিবেশ দ্রুত অবনতি ঘটছে।
গবেষক মো. শাকির আহম্মদ বলেন, মিঠাপানির এই দূষণ দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ নদী কমিশনের তালিকাভুক্ত আন্তসীমান্ত নদী সুতাং ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একসময় হাওর অঞ্চলের যোগাযোগ ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলেও বর্তমানে নদীটি মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অনেক শিল্পকারখানা বর্জ্য শোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে ফেলছে। এর ফলে করাব, ছড়িপুর, উচাইল, রাজিউড়া ও সাধুর বাজারসহ নদীতীরবর্তী এলাকায় পানি কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে।
নদী দূষণের প্রভাব স্থানীয় মানুষের জীবনেও পড়তে শুরু করেছে। ভাদগরি গ্রামের বাসিন্দা শফিক মিয়া বলেন, সুতাং নদীর পানিতে গোসল করলে শরীরে চুলকানি শুরু হয়।
সাধুর বাজার এলাকার শিক্ষক গুলনাহার বেগম বলেন, নদীর দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাস ও স্কুলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে এমন পরিস্থিতি ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দূষিত পানি সেচকাজে ব্যবহারের কারণে ভারী ধাতু ধানের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, স্নায়ুরোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গবেষক ও পরিবেশবিদেরা সুতাং নদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার চালু ও কার্যকর করা, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নদীর পানির নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
