মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ প্রত্যশী ৪০জনের প্রথম দলকে প্রশিক্ষণ দেয়ার আগে সওজ ডাকবাংলোর টিলার উপরে ৪০জন তরুণ যুবককে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়। এসময় উপস্থিত জনগণও মাটিতে হাত রেখে শপথ নেন। পাকবাহিনী বিয়ানীবাজারে অবস্থানকালে এই ডাকবাংলো হয়ে উঠে তাদের অপকর্মের প্রধান আস্তানা। ডাকবাংলো ছিল পাকবাহিনীর ক্যাম্প। ক্যাম্প প্রধান ক্যাপ্টেন ইফতেখার হোসেন গন্দল এখানেই অবস্থান নেয়। বিভিন্ন স্থান থেকে নারীদের ধরে এখানে আনা হতো গন্দলের লালসা পূরণ করতে। বাংলোর চত্বরে মাদুর বিছিয়ে বসতো শান্তি কমিটির মজলিসে শুরার বৈঠক। চলতো হত্যা, লুন্ঠন, অগ্নি সংযোগ আর ধর্ষণের পরিকল্পনা। আর হত্যার পূর্বে ডাকবাংলোর চত্বরের কাঠাল গাছের ডালে ও রান্না ঘরের কড়ি বর্গায় মানুষকে উল্টো করে ঝুলিয়ে চলতো অকথ্য নির্যাতন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিক উদ্দিন বলেন, আমাদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন আনছার বাহিনীর বিয়ানীবাজার থানা কমান্ডার কাজী আলাউদ্দিন। ডাকবাংলো ও রসুই ঘর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য স্মৃতি। এই স্থানটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পাকবাহিনীর নির্মমতার কথা দৃশ্যমান করে লিপিবদ্ধ করা উচিত। এতে করে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।

বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের পূর্ব মুড়িয়ায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিচিহ্ন সারপার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টর্চারসেলকে স্মৃতিসৌধে রূপান্তর করা হলেও নয়াগ্রাম এলাকার গণকবর এখনও অবহেলা ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৭১ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলার পাক বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিকামী মানুষের একমাত্র সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল পূর্ব মুড়িয়া এলাকায়। মুক্তিযোদ্ধাদের বিতাড়িত করে পাকিস্তানি হানাদাররা দখল করে পূর্ব মুড়িয়া এলাকা। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় মুক্তিকামী মানুষদের সারপার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনে নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া এবং আরো কয়েকজনের লাশ নয়াগ্রামের বর্তমান বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন সুনাই নদীর চর ও আশেপাশের বিভিন্ন গর্তে এনে গণকবর দেয়া হয়।

উপজেলার বৈরাগীর ত্রিমূখী নামক স্থানে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জামালের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয় ‘শহীদ জামাল স্মৃতি স্তম্ভ। এটি বিয়ানীবাজারে নির্মিত প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ। গঠিত হয় শহীদ জামাল স্মৃতি সংসদ নামে একটি সংগঠনও। কিন্তু স্বাধীন দেশেও স্বস্থানে টিকে থাকতে পারেনি এই স্তম্ভটি। স্তম্ভটির পাশেই গড়ে উঠেছে পান-সিগারেটের দোকান। আর এসব ভ্রাম্যমান দোকানের ভিড়ে অনেকটা আড়ালেই থেকে যায় স্তম্ভটি।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে উপজেলার রাধু টিলা (বর্তমান নাম শহীদ টিলা)’য় পাক হানাদার ও তাদের দেশীয় দোসররা এই স্থানে হত্যা করে সুপাতলা গ্রামের ঘোষ পরিবারের ১২ সদস্যকে। এখানেই হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন, বিয়ানীবাজার পৌরসভার সাবেক প্রশাসক তফজ্জুল হোসেনের পিতা ও ভাইকে। এছাড়া আরও কয়েকজনকে এখানে হত্যা ও মাটি চাপা দেয়া হয়। স্বাধীনতার পর রাধু টিলায় স্থাপিত হয়েছিল স্মৃতিসৌধ। শহীদ পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, পাকিস্তানীদের নির্যাতনে নিহত তার পিতা ও ভাইয়ের স্মৃতিফলক এখানে নির্মাণ করা হয়েছে।

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দার্শনিক শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (জিসি দেব) স্মরণে এই স্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছিল উপজেলার লাউতা গ্রামে তাঁর নিজ পোত্রিক ভিটায়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে এটির দশাও জরাজীর্ণ। তাঁর বাড়ি নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলায় বেদখলে রইয়ে গেছে বাড়িটি। বুদ্ধিজীবী দিবসে জিসি দেব স্তম্ভে পুষ্প শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়া, বছরের অন্যান্য দিনে এখানে কোন কর্মসূচি চোখে পড়েনা।

এছাড়াও বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই গদারবাজার ও মুড়িয়ার গণকবরগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। দুবাগ, শেওলা ও আলীনগরসহ প্রভৃতি স্থানের গণহত্যার কথা এখন প্রবীনদের গল্পেই বিদ্যমান। অধিকাংশই স্থানীয় কোন প্রবীন ব্যক্তি দেখিয়ে না দিলে চেনার উপায় নেই। কোন স্থান নিয়ে রয়েছে দ্বিমত আবার অনেক স্থানের কথা সঠিক কারো মনে নেই। এগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরার বিষয়টি কেউ বিবেচনাই করছেনা!

বিয়ানীবাজার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ কাদির বলেন, সময়ের পরিক্রমায় রাধু টিল্লা, কাঁঠালতলা বধ্যভূমি ও সারপার স্কুলের টর্চারসেল সংরক্ষিত হলেও এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতিচিহ্ন। শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই নয়, ব্যক্তি কিংবা সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগেও এসব স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

By সুপ্রভাত সিলেট

সুপ্রভাত সিলেট (Suprobath Sylhet) একটি দৈনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সিলেটসহ সারাদেশের সর্বশেষ সংবাদ, স্থানীয় ঘটনা, জাতীয় খবর, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদ পাঠকদের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়াই এই সংবাদমাধ্যমের মূল লক্ষ্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকদের তথ্যসমৃদ্ধ রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে সুপ্রভাত সিলেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *